দেশের ৫৬ শতাংশ গ্যাসই উত্তোলন করে মার্কিন কোম্পানি

গ্যাস সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন বাংলাদেশ

জাতীয় গ্রিডের জন্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের অর্ধেকের বেশি সরবরাহ করছে মার্কিন জায়ান্ট শেভরন। দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি স্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি করবে বাংলাদেশ। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন ও এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বড় অংশীদার।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আবারো যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

স্থানীয় উৎপাদন থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক)। এর মধ্যে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন পরিচালিত গ্যাস ক্ষেত্র থেকে সরবরাহ আসছে ৯৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা স্থানীয়ভাবে গ্যাস উত্তোলনের ৫৬ শতাংশ। আর দেশে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। যার মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানিটির হিস্যা ৩৬ শতাংশ।

দেশে মোট ২০টি ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। এসব গ্যাস ফিল্ডের মোট উত্তোলনের ৪৮ শতাংশ আসছে বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড একাই দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রেখেছে। এ ফিল্ডের মজুদ শেষ পর্যায়ে। ফিল্ডটির উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। গ্রিডে যদি বৃহৎ আকারে বিবিয়ানার গ্যাস সরবরাহ কমে যায়, তাহলে দেশের শিল্প-বিদ্যুৎ খাত তীব্র ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

দেশে মার্কিন কোম্পানি শেভরন ১৯৯৫ সালে পিএসসি চুক্তির আওতায় অনশোর ব্লক ১২-তে কাজ পায়। এরপর ১৯৯৮ সালে বিবিয়ানা ফিল্ডটি আবিষ্কৃত হয়। ২০০৭ সালে এ ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। ধারাবাহিকভাবে ফিল্ডটি ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে গ্যাস উত্তোলনে রয়েছে। বিবিয়ানা ছাড়াও শেভরন জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাস ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। এ দুটি ফিল্ডের দৈনিক উৎপাদন যথাক্রমে ১৩১ মিলিয়ন ঘনফুট ও ১০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশের গ্যাস উত্তোলনেই যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কাজ করছে তা নয়। এর বাইরে আরেক মার্কিন কোম্পানি দেশের এলএনজি সরবরাহ কার্যক্রমে বড় পরিসরে কাজ করছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দুটির একটি পরিচালনা করছে এক্সিলারেট এনার্জি। দেশে গ্যাস সরবরাহ সংকটে প্রথম যে এলএনজি টার্মিনাল দেশে নির্মাণ করা হয় তা যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি সই হয়। এরপর ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। দেশে দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতার মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময়ে দেশে এলএনজি সরবরাহে কাজ করছে এক্সিলারেট। তাদের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তি রয়েছে পেট্রোবাংলার।

আমদানীকৃত এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশনের পর পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দেশে দুটি ভাসমান টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ) আছে। এগুলোর একটির মাধ্যমে দেশে এলএনজি সরবরাহের পাশাপাশি এক্সিলারেট এনার্জি স্পট মার্কেট থেকেও পেট্রোবাংলাকে এলএনজি দিচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্কিন কোম্পানি দেশের গ্যাস খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। আমদানি, জ্বালানি অবকাঠামোতে দেশটির বিভিন্ন কোম্পানি বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’-এর (পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি) আওতায় আগামী ১৫ বছর মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ায় এ নির্ভরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন জ্বালানি ক্রয়ের অথবা বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সেই ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে। এর মধ্যে মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) জন্য দীর্ঘমেয়াদি ‘অফট্র্যাক এগ্রিমেন্ট’ বা অগ্রিম ক্রয়চুক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতে ওয়াশিংটন এখন ঢাকার প্রধান কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ঢাকা সফরে আসা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে সচিবালয়ে গতকাল দুপুরে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। পরে জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মেটা পেজে দেয়া পোস্টের বার্তায় বলা হয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি কাপুর এবং রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের সর্বত্র জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সাক্ষাতে আলোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাতে সারা পৃথিবীতে জ্বালানির একটা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমাদেরও শর্টেজ হয়ে গেছে। যেগুলো কমিটমেন্ট ছিল সেগুলো আসা বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করলাম সংকট মুহূর্তে তারা আমাদের কী সহযোগিতা করতে পারে। রাষ্ট্রদূতের পাশাপাশি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি যিনি এসেছিলেন তাকেও একই কথা বলেছি। আমরা আপনাদের সঙ্গে লংটার্মে যেতে চাই বলেছি। আর এখন ক্রাইসিস পিরিয়ডে আমাদেরকে সহায়তার জন্য অনুরোধ করেছি। তারা বলেছে তাদের হেড অফিসে কথা বলে আমাদেরকে জানাবে।’

জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কৌশলী ও বাস্তবসম্মত অবস্থানের কথা বলছেন। তাদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ ছাড়া বিকল্প নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সঙ্গে গ্যাস খাতে কাজ করছে। এখন প্রয়োজন পড়লে যেকোনো উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হবে। সেটা যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর কিংবা অন্য যে কোনো দেশ হোক। যদিও বিকল্প উৎস থেকে সেই অর্থে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে। জ্বালানি সংকটের বড় বিপর্যয়ে পড়ার আগেই অল্প করে হলেও লোডশেডিং দিতে হবে।’

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ এবং এর স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমানে ‘আপৎকালীন সরবরাহ’ নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার। এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানির প্রাপ্যতা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

তাদের বিশ্লেষণে, জ্বালানি কেবল একটি পণ্য নয়, বরং একটি ‘কৌশলগত উপাদান’। তাই বড় কোনো শক্তি বা অংশীদারের কাছ থেকে জ্বালানি কেনার মাধ্যমে একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথমত, এখন আপৎকালীন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে, কতদিন চলবে আমরা তা জানি না। তাই এ মুহূর্তে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখান থেকেই নিতে হবে। দামের ব্যাপারে এখন বিবেচনার সুযোগ কম। সে বিবেচনায় এখন যদি যুক্তরাষ্ট্র আমাদের (জ্বালানি) দিতে রাজি হয়, অন্তত এখনকার অনিশ্চয়তা কাটানোর জন্য নেয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, কাতারের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি আছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও হতে পারে। তখন আমরা ওদের কাছ থেকে কিনব বলেছি, এখন অন্য জায়গা থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে পাই আমরা নেব। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার আলোকে সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা হলো সবকিছুর ড্রাইভার।’

হুমায়ুন কবির আরো বলেন, যেহেতু ইদানীংকালে আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে যাচ্ছি, তাই একটা জরুরি বিষয় হচ্ছে কস্ট অ্যান্ড প্রাইস, আরেকটা হচ্ছে গ্যারান্টেড সাপ্লাই। পার্টনার যে-ই হোক এ দুটো জিনিস নিশ্চিত করতে হবে। যখন মার্কেট ঠিক হয়ে যাবে, তখন যদি কাতার আমাকে যে মূল্যে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রও যদি সে মূল্যে দেয় তাহলে তো নিতে অসুবিধা নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তেমন কোনো বড় ঝুঁকি আমি দেখি না।’

আরও